আধুনিক বিচার ব্যবস্থায় ফরেনসিক সাইকোলজির গুরুত্বঃ
বিচারব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। তবে, শুধুমাত্র সাক্ষ্যপ্রমাণ বা আইনগত বিশ্লেষণ দিয়ে সব সময় প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধী তার অপরাধ গোপন করতে চায়, নিরীহ ব্যক্তি মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পড়ে, বা সাক্ষী সত্য-মিথ্যার মিশ্রণে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়। ঠিক এই জায়গাতেই ফরেনসিক সাইকোলজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ফরেনসিক সাইকোলজি অপরাধ বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের সংমিশ্রণে এমন একটি ক্ষেত্র, যা অপরাধী ও সাক্ষীর মানসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপরাধ তদন্ত ও বিচার ব্যবস্থাকে সহায়তা করে। এটি অপরাধীদের মানসিক প্রোফাইল তৈরি, মিথ্যা স্বীকারোক্তি শনাক্ত, এবং আদালতে মানসিক স্বাক্ষ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। আধুনিক বিচার ব্যবস্থায় এটি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, বিশেষত যখন অপরাধের ধরন এবং তদন্তের কৌশল ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে।
ফরেনসিক সাইকোলজির মূল ভূমিকা-
১. অপরাধীদের মানসিক বিশ্লেষণ ও প্রোফাইল তৈরিঃ
প্রত্যেক অপরাধীর একটি নির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক প্রোফাইল থাকে, যা তার আচরণ, মানসিক অবস্থা, এবং অপরাধ সংঘটনের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে। ফরেনসিক সাইকোলজিস্টরা অপরাধীদের মানসিক গঠন বিশ্লেষণ করে এবং তদন্তকারীদের অপরাধীর সম্ভাব্য উদ্দেশ্য ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা দিতে পারেন।
২. সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা ও মিথ্যা স্বীকারোক্তি শনাক্তকরণঃ
অনেক সময় সাক্ষী ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য প্রদান করে। আবার, মানসিক চাপে পড়ে নির্দোষ ব্যক্তিও মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে পারে। ফরেনসিক সাইকোলজিস্টরা সাক্ষীর শরীরী ভাষা, মানসিক প্রতিক্রিয়া এবং কথোপকথনের ধরণ বিশ্লেষণ করে তার বক্তব্যের সত্যতা মূল্যায়ন করেন।
৩. ইন্টারভিউ ও ইন্টারোগেশন এর পদ্ধতিসমূহঃ
তদন্তকারী সংস্থাগুলো অপরাধীদের কাছ থেকে সত্য উদঘাটনের জন্য বিভিন্ন মানসিক কৌশল ব্যবহার করে। ফরেনসিক সাইকোলজিস্টরা এমন জিজ্ঞাসাবাদ কৌশল নির্ধারণ করেন, যা অপরাধীর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে এবং সত্য বের করে আনতে সহায়তা করে।
৪. শিশু ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সাক্ষ্য গ্রহণঃ
শিশু নির্যাতন বা মানসিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের সাথে ঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য গ্রহণ অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। ফরেনসিক সাইকোলজিস্টরা এমন পদ্ধতি অনুসরণ করেন, যাতে তারা নিরপেক্ষভাবে সত্য প্রকাশ করতে পারেন এবং তাদের মানসিক ক্ষতি না হয়।
৫. সিরিয়াল অপরাধী ও সাইকোপ্যাথদের চিহ্নিতকরণঃ
ফরেনসিক সাইকোলজিস্টরা অপরাধের ধরণ ও মানসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিরিয়াল অপরাধী ও সাইকোপ্যাথদের চিহ্নিত করতে পারেন। এর ফলে অপরাধ প্রতিরোধ ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়।
৬. ক্রাইম প্রিভেনশন ও সংশোধনমূলক কার্যক্রমঃ
ফরেনসিক সাইকোলজির মাধ্যমে অপরাধ প্রবণতা নির্ণয় করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। অপরাধীদের পুনর্বাসন ও সংশোধনমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজে পুনরায় একীভূত করাও সম্ভব হয়।
বাংলাদেশে অপরাধের ধরন দিন দিন পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশেষ করে সাইবার ক্রাইম, সহিংসতা, হয়রানি এবং নকল বা জাল ডকুমেন্টজনিত অপরাধ মোকাবিলায় ফরেনসিক সেবাপ্রাপ্তি ও এর কার্যাবলির গুরুত্ব অপরিসীম।
বর্তমানে দেশের বিচার ব্যবস্থায় অপরাধ তদন্ত সংস্থা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং আদালতের মধ্যে ফরেনসিক সাইকোলজির অন্তর্ভুক্তি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
© আবির হোসেন আকাশ
সাইকোলজিস্ট, বিআইএফপিএস।